ঢাকা , শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫ , ২১ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
সংবাদ শিরোনাম
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে বড় আঘাত গণতান্ত্রিক স্থিতিশীল শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন মোদির দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করতে বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড এমওইউ মোদীকে দশ বছর আগের কথা মনে করিয়ে ছবি উপহার ইউনূসের নতুন সমীকরণে বাংলাদেশ-ভারত বাস চালকের হদিস মেলেনি আহত শিশু আরাধ্যকে ঢাকায় হস্তান্তর নিহত বেড়ে ১১ স্বস্তির ঈদযাত্রায় সড়কে ঝরলো ৬০ প্রাণ চালের চেয়েও ছোট পেসমেকার বানালেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা আ’লীগের নেতাদের রাজকীয় ঈদ উদযাপনে ক্ষুব্ধ কর্মীরা আন্দোলনে ফিরবেন বেসরকারি কলেজ শিক্ষকরা মাদারীপুরে আগুনে পুড়ল ২ বাড়ি ভৈরবের ত্রি-সেতুতে দর্শনার্থীদের ভিড় বর্ষবরণের আয়োজন, পাহাড়ে উৎসবের রঙ ঈদের আমেজ কাটেনি বিনোদন স্পটে ভিড় আ’লীগকে নিষিদ্ধ করা বিএনপির দায়িত্ব নয় নতুন নিয়মে বিপাকে ট্রাভেল এজেন্সিগুলো ঈদের আগে বেতন-বোনাস পেয়ে স্বস্তিতে সাড়ে ৩ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক ঈদযাত্রায় সদরঘাটে চিরচেনা ভিড় মিয়ানমারে ভূমিকম্পে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা
৫ কোটি টাকা চুক্তিতে আনার খুন ॥ ঢাকায় ধরা পড়ার ভয়ে কলকাতায় আনারকে খুন করা হয় ॥ হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী তারই বন্ধু ও ব্যবসায়িক অংশীদার আক্তারুজ্জামান শাহীন

সংসদ সদস্য আনার হত্যাকাণ্ড : লাশ টুকরো টুকরো করে ট্রলিব্যাগে করে ফেলা হয়

  • আপলোড সময় : ২৩-০৫-২০২৪ ০৮:২৪:৪২ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ২৪-০৫-২০২৪ ১০:৫৪:২৪ পূর্বাহ্ন
সংসদ সদস্য আনার হত্যাকাণ্ড : লাশ টুকরো টুকরো করে ট্রলিব্যাগে করে ফেলা হয় সংসদ সদস্য আনার হত্যাকাণ্ড
জনতা ডেস্ক
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নানান তথ্য পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। তার লাশ টুকরো টুকরো করে দফায় দফায় বিভিন্ন জায়গায় সরানো হয়েছে। আনার হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী তারই ছোটবেলার বন্ধু ও ব্যবসায়িক অংশীদার আক্তারুজ্জামান শাহীন। আনোয়ারুল আজীম আনারকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় ২/৩ মাস আগে। এই পরিকল্পনা করা হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণে ঢাকায় তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছিল না। ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। ফলে কলকাতাকেই হত্যাকাণ্ডের জন্য নিরাপদ মনে করে খুনিরা। সংসদ সদস্য আনারকে হত্যাকাণ্ডের জন্য ৫ কোটি টাকা চুক্তি করা হয়েছিল। জানা গেছে, প্রায় ১০ দিন নিখোঁজ থাকার পর গত বুধবার ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনারের মৃত্যুর বিষয়টি সামনে আসে। গত বুধবার সকালে নিউটাউনের ওই অভিজাত আবাসনে আসে নিউটাউন থানা পুলিশ। পরে সঞ্জীবা গার্ডেনের (ব্লক ৫৬ বিইউ) ঘর খুলে ভেতরে রক্তের দাগ দেখতে পায়, পাশাপাশি ট্রলিব্যাগ উদ্ধার করা হয়। সেই ব্যাগের মধ্যেও রক্তের দাগ ছিল।
সূত্রে জানা গেছে, ওই আবাসনের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে পুলিশ জানতে পারে, গত ১৩ মে এই আবাসনে ওঠেন আনোয়ারুল আজীম। তার সঙ্গে ছিলেন আরও তিনজন, যার মধ্যে ছিলেন একজন নারী। এরপর ওইদিনই আনোয়ার আবাসনের বাইরে না বেরোলেও বাকিরা বেশ কয়েকবার ওই আবাসনে আসা-যাওয়া করেন। পুলিশ জানিয়েছে, কলকাতার পার্শ্ববর্তী শহরাঞ্চল রাজারহাট নিউটাউনের সঞ্জীবা গার্ডেনসে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয় সংসদ সদস্য আনারকে। তারপর দেহ টুকরো টুকরো করা হয়। যেন কাটা দেহ থেকে গন্ধ না ছড়ায় তাই দেহাংশগুলো ফ্রিজে রেখে দেয়া হয়েছিল। আনোয়ারুল আজীমকে খুন করার পর তার মরদেহ আবাসন থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। সিসিটিভিতে ধরা পড়ার ভয়ে আনারের দেহ টুকরো টুকরো করে নেয়া হয়েছিল, যেন কেউ বুঝতে না পারে। এই টুকরো দেহাংশ ফেলার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল দুজনকে। সেই দুই ব্যক্তির হদিস পাওয়া গেলেই জানা যাবে কোথায় কোথায় দেহাংশ ফেলা হয়েছে। ওই আবাসন থেকে ট্রলিব্যাগ পাওয়া গেছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ওই ব্যাগে করেই আনারের দেহাংশ ফেলা হয়েছে।
এছাড়াও গত বুধবার রাতে আনোয়ারুল আজীম আনার খুনে ব্যবহৃত একটি গাড়ি উদ্ধার করেছে নিউটাউন থানার পুলিশ। গাড়ির নম্বর ডই ১৮অঅ ৫৪৭৩। সঞ্জীবা গার্ডেনসে বিলাসবহুল আবাসনের সিসিটিভি দেখে গাড়িটিকে শনাক্ত করা হয়। উদ্ধার গাড়িটি থেকে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিশেষজ্ঞরা নমুনা সংগ্রহ করে। এই গাড়িটি নিয়ে আনোয়ারুল আজীম আনার নিখোঁজ হওয়ার দিন থেকে কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছিলেন। সেই গাড়িতে আর কে ছিল তার খোঁজ করছে পুলিশ। গাড়ির মালিককে ডেকে পাঠানো হয় নিউটাউন থানায় জিজ্ঞাসাবাদ করা জন্য। সঞ্জীবা গার্ডেনস অঞ্চলটি নিউটাউন থানার অন্তর্গত সেই কারণেই নিউটাউন থানা পুলিশ একটি খুনের মামলা রুজু করেছে। এরইমধ্যে মামলার তদন্তভার রাজ্য পুলিশের সিআইডির হাতে দেয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সামনে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। দিনভর নানান গুঞ্জনের পরে জানা গেলো, হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী তারই ছোটবেলার বন্ধু ও ব্যবসায়িক অংশীদার আক্তারুজ্জামান শাহীন। তিনি ঝিনাইদহের বাসিন্দা ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। শাহীনের ভাই ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর পৌর মেয়র। এই হত্যার পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল আরেক বন্ধু ও চরমপন্থি নেতা আমানউল্লাহ আমানকে। কলকাতায় বসে হত্যার চূড়ান্ত ছক এঁকে বাংলাদেশে চলে আসেন শাহীন। পরে আমানসহ ছয়জন মিলে এমপি আজীমকে সঞ্জীবা গার্ডেন নামের একটি ফ্ল্যাটে ট্র্যাপে ফেলে ডেকে আনেন। এরপর তাকে জিম্মি করে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ কেটে টুকরো টুকরো করে ট্রলিব্যাগে ভরে ফেলা হয় অজ্ঞাত স্থানে।
আনারকে হত্যার জন্য পাঁচ কোটি টাকা দিতে চেয়েছিলেন আক্তারুজ্জামান শাহীন। হত্যাকাণ্ডের আগে তাকে কিছু টাকা পরিশোধ করা হয়। বাকি টাকা দেয়ার কথা ছিল হত্যাকাণ্ডের পর। তাদের মিশন সফল হওয়ার পর আনারের মরদেহের টুকরোগুলো গুম করতে সিয়াম ও জিহাদ নামের দুজনকে দায়িত্ব দিয়ে ঢাকায় চলে আসেন আমান। ঢাকায় এসে দেখা করেন আক্তারুজ্জামান শাহীনের সঙ্গে। তবে শাহীন পরবর্তীসময়ে তাকে কত টাকা দিয়েছেন সেটা জানা যায়নি। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে তিনজনকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ওয়ারী বিভাগ। তারা হলেন- এ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয়া চরমপন্থি দল পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা আমানউল্লাহ আমান, মোস্তাফিজ ও ফয়সাল।
গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আমান জানিয়েছেন, এমপি আনোয়ারুল আজীম আনারকে হত্যার জন্য পাঁচ কোটি টাকা দিতে চেয়েছিলেন আক্তারুজ্জামান শাহীন। হত্যাকাণ্ডের আগে তাকে কিছু টাকা পরিশোধ করা হয়। বাকি টাকা দেয়ার কথা ছিল হত্যাকাণ্ডের পর। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ঢাকায় এসে মোহাম্মদপুরের বোনের বাসায় আত্মগোপনে ছিলেন আমান। সেখান থেকেই তাকে আটক করা হয়েছে। গত ৩০ এপ্রিল শাহীন চরমপন্থি নেতা আমান ও বান্ধবি সিলিস্তি রহমানকে নিয়ে কলকাতা যান। সেখানে আগে থেকেই ভাড়া করে রাখা নিউটাউন এলাকার সঞ্জীবা গার্ডেনের একটি ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে ওঠেন তারা। কলকাতায় আরও আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন শাহীনের দুই সহযোগী সিয়াম ও জিহাদ। সেখানে বসে তারা এমপি আনারকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। হত্যার পুরো দায়িত্ব আমানকে বুঝিয়ে দিয়ে ১০ মে দেশে চলে আসেন শাহীন। পরিকল্পনা অনুযায়ী আমান বাংলাদেশ থেকে আরও দুই ভাড়াটে কিলারকে নিয়ে যান কলকাতায়। ফয়সাল শাজী ও মোস্তাফিজ নামে দুই ভাড়াটে খুনি ১১ মে কলকাতায় গিয়ে আমানের সঙ্গে যোগ দেন।
আমানকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের বরাতে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, এমপি আনার যে ১২ মে কলকাতায় যাবেন তা আগে থেকেই জানতেন শাহীন। তাকে হত্যার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে বলেন তার গ্যাংকে। তারা একাধিক চাপাতিও সংগ্রহ করে রাখে। গত ১২ মে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত দিয়ে কলকাতায় যান আনার। প্রথম দিন তিনি তার বন্ধু গোপালের বাসায় থাকেন। পরদিন ১৩ মে কৌশলে এমপি আনারকে নিউটাউনের সেই ফ্ল্যাটে কৌশলে ডেকে নিয়ে যান হত্যাকারীরা। বিকেলের দিকে এমপি আনার সঞ্জীবা গার্ডেনের সেই ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন। এরপর আমান তার সহযোগী ফয়সাল, মোস্তাফিজ, সিয়াম ও জিহাদ মিলে এমপিকে চাপাতির মুখে জিম্মি করেন। এসময় তারা এমপির কাছে শাহীনের পাওনা টাকা পরিশোধের কথাও বলেন। বিষয়টি নিয়ে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে সবাই মিলে আনারকে জাপটে ধরে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করেন। হত্যার পর আমান বিষয়টি জানান শাহীনকে।
আমানের দেয়া তথ্যের বরাতে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, শাহীনের পরামর্শ মতো মরদেহ গুম করতে কেটে টুকরো টুকরো করা হয়। এরপর ফ্ল্যাটের কাছেই শপিংমল থেকে আনা হয় দুটো বড় ট্রলিব্যাগ ও পলিথিন। এমপি আনারের মরদেহের টুকরোগুলো পলিথিনে পেঁচিয়ে ট্রলিব্যাগে ভরা হয়। ঘটনার রাতে মরদেহের টুকরোসহ দুটি ট্রলিব্যাগ বাসাতেই রাখা হয়। এরমধ্যে তারা বাইরে থেকে ব্লিচিং পাউডার এনে ঘরের রক্তের দাগ পরিষ্কার করেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, কলকাতা পুলিশ ওই ফ্ল্যাট ও আশপাশের ভবনের সব সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আমান ও তার সহযোগীদের ট্রলিব্যাগ আনা-নেয়া, এমপি আনারের বাইরে রাখা জুতা ভেতরে নেয়ার দৃশ্যও দেখা যায়। এছাড়া সিলিস্তি রহমান নামে শাহীনের বান্ধবীর বাইরে থেকে পলিথিন ও ব্লিচিং পাউডার নিয়ে আসার দৃশ্যও সিসি ক্যামেরার ফুটেজে আছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আমানের স্বীকারোক্তি ও সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, হত্যাকাণ্ডের পরদিন বিকেলে একটি ট্রলিব্যাগ হাতে নিয়ে বাসা থেকে বের হন আমান। জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে তিনি জানান, বাসা থেকে বের হয়ে পাশের একটি শপিংমলের সামনে সেই ট্রলিব্যাগটি সিয়ামের হাতে তুলে দেন। সিয়াম সেই ব্যাগ নিয়ে তাদের আগে থেকেই ভাড়া করে রাখা গাড়ি নিয়ে অজ্ঞাত স্থানের দিকে চলে যান। তবে সেই গাড়িচালক কলকাতা পুলিশকে জানান, সিয়াম কিছুদূর যাওয়ার পর ব্যাগটি নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়েন। লাশের টুকরো আরেকটি ব্যাগে ছিল। সেই ব্যাগ থেকে দুর্গন্ধও ছড়ানো শুরু করেছিল। সেই ব্যাগটি সহযোগীদের অন্য কোথাও ফেলে দেয়ার নির্দেশনা দিয়ে ১৫ মে সিলিস্তিকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন আমান।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, হত্যাকাণ্ডের পর আমানের নির্দেশনা অনুযায়ী তার দুই সহযোগী এমপি আনারের ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন নিয়ে দুদিকে চলে যান, যেন তদন্তকারী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আনারের অবস্থান সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়। ১৭ মে মোস্তাফিজ ও ১৮ মে ফয়সাল বাংলাদেশে ফেরত আসেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা সাজিয়ে দিয়ে ১০ মে ঢাকায় চলে আসেন আক্তারুজ্জামান শাহীন। এমপি আনোয়ারুল আজীম নিখোঁজের বিষয়টি দেশে আলোচিত হলে তিনি ১৮ মে আবারও ভারত হয়ে নেপালে চলে যান। ২১ মে নেপাল থেকে চলে যান দুবাই। ২২ মে দুবাই থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। যুক্তরাষ্ট্রে শাহীনের ঠিকানা, নিউইয়র্কের ৩৭৯ ইস্ট সেভেন্থ স্ট্রিট ?ব্রুকলিন এলাকায় বলে জানা যায়।
এমপি আনোয়ারুল আজীমকে নির্মমভাবে হত্যার নেপথ্যে সোনা চোরাচালানের অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। আক্তারুজ্জামান শাহীন নিজেও একজন সোনা চোরাচালানকারী। এমপি আনোয়ারুল আজীমের বিরুদ্ধেও সোনা চোরাচালানের অভিযোগ রয়েছে। কলকাতায় শাহীন ও আজীমের যৌথ ব্যবসা আছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সোনা চোরাচালানের বিপুল অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
এদিকে আনোয়ারুল আজীম আনার ভারতে খুন হওয়ার ঘটনায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা দায়ের হয়েছে। মামলা নম্বর-৪২। গত বুধবার সন্ধ্যায় মামলার এজাহার দায়ের করেন তার মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মু. আহাদ আলী। তিনি জানান, সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি। সবাই অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে দেয়া হয়েছে। এখন তদন্ত করে আসামিদের আইনের আওতায় আনা হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সাংবাদিকদের ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, রাজধানীর গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকায় বসে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনারকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তার বাল্যবন্ধু ও ব্যবসায়ীক পার্টনার আক্তারুজ্জামান শাহীন। শাহীনের পরিকল্পনায় হত্যার কাজটি করেন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা আমান উল্লাহ আমান ওরফে শিমুল। হারুন বলেন, শাহীন দুই থেকে তিন মাস ধরে আনারকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। তবে গোয়েন্দা পুলিশের শক্তিশালী তদন্ত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণে তারা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কলকাতাকে বেছে নেয়।
ডিএমপির গোয়েন্দা প্রধান বলেন, কলকাতায় গত ১৩ মে সংসদ সদস্য আনারকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। তার লাশ গুম করার জন্য পৈশাচিকভাবে মরদেহ টুকরো টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেয়া হয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের কাছে ঘটনায় জড়িত মূলহত্যাকারীসহ আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে আমরা জানতে পারি সংসদ সদস্য আনারকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় দুই থেকে তিন মাস আগে। হারুন জানান, ঢাকার গুলশান ও বসুন্ধরায় বসে একাধিকবার আলোচনা করেছে পরিকল্পনাকারীরা। আনারকে হত্যা করতে প্রথমে তারা দেশের মাটি ব্যবহার করতে চেয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে পুলিশের তদন্ত সক্ষমতার কথা চিন্তা করে তারা দেশের বাইরের মাটিতে পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত ২৫ এপ্রিল কলকাতায় তারা বাসা ভাড়া করে। সে বাসায় নিহত সংসদ সদস্যের বন্ধু আক্তারুজ্জামান শাহীন, তার বান্ধবী এবং পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা আমান উল্লাহ আমান ওরফে শিমুল ওঠেন। গত ৩০ তারিখ ঢাকা থেকে বিমানে করে কলাকাতায় গিয়ে সেই বাসায় ওঠেন তিনি। মূলত পরিবার নিয়ে থাকার তথ্য দিয়ে বাড়ির মালিকের সঙ্গে চুক্তি করেন শিমুল। হারুন আরও বলেন, হত্যাকারীরা দুই মাস ধরে সংসদ সদস্যকে নজরদারিতে রাখছিলেন। কখন সে কলকাতায় যায়। সংসদ সদস্য বিভিন্ন সময়ে কলকাতায় যেতেন। সেখানে তিনি দীর্ঘদিন বাস করেছেন। সেখানে তার বন্ধু-বান্ধব রয়েছে। তারা এই সুযোগটি কাজে লাগিয়েছেন। সংসদ আনার কলকাতায় গিয়ে তার বন্ধুর গোপালের বাসায় গিয়ে ওঠেন। তারা জানত ১২ তারিখ সংসদ সদস্য কলকাতায় যাবেন। হত্যার পরিকল্পনাকারীরা ৩০ এপ্রিল কলকাতায় গিয়ে স্থানীয় দুজনকে ঠিক করে। তারা হলেন-জিহাদ ওরফে জাহিদ ও সিয়াম। হত্যার পরিকল্পনাকারী শাহীন হত্যার পর কোন গাড়ি ব্যবহার করা হবে। কাকে কত টাকা দিতে হবে। সেগুলো ঠিক করে ১০ মে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। নিহত সংসদ সদস্য কলাকাতায় যাওয়ার পর ১৩ তারিখ ওই বাসায় যান। যাওয়ার পথে একটি সাদা গাড়িতে করে ফয়সাল নামের এক ব্যক্তি তাকে নিয়ে যায়। গাড়িটি কিছু পথ যাওয়ার পরে হত্যাকারী আমান উল্লাহ সেই গাড়িতে ওঠে। গাড়িটির চালক ছিলেন রাজা। সেই বাসায় যাওয়ার পর মোস্তাফিজসহ তারা বাসায় প্রবেশ করে। বাসাটিতে আগে থেকে জাহিদ ও সিয়াম অবন্থান করছিলেন। ১৩ তারিখ দুপুরে ২টা ৫১ মিনিটে বাসায় প্রবেশ করেন। এর ৩০ মিনিটের মধ্যেই হত্যা করা হয় সংসদ সদস্য আনারকে। হত্যার পরে ঘাতকরা সংসদ সদস্যের মোবাইল ফোন দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে ম্যাসেজ পাঠায়। এরপর তারা হাড় থেকে মাংস আলাদা করে। পরবর্তীতে দুটি ব্রিফকেসে করে জিহাদ ও সিয়াম মরদেহ গাড়িতে করে ফেলে দেয়। হত্যার পরে সংসদ সদস্যের চিহ্ন না থাকে। কাজ শেষ করে ১৫ তারিখ আমান উল্লাহ ও শাহীনের প্রেমিকা শিরিস্তি দেশে ফিরে আসে। সবাই ফিরে আসায় হত্যার মাস্টার মাইন্ড শাহীন বিমানে করে দিল্লি সেখানে ২ ঘণ্টার ট্রানজিট নিয়ে কাঠমুন্ডু যায়। সেখান থেকে অন্য কোনো দেশে চলে যান।
হারুন আরও বলেন, হত্যার বিষয়টি প্রকাশ হওয়ার পরে দেখা গেছে, হত্যাকারীরা তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করতে নিহত সংসদ সদস্যের দুটি মোবাইল ফোন দুই দিকে নিয়ে যায়। এরপর তারা বিভিন্ন জনকে বার্তা পাঠানো ও কল করতে থাকে। ফলে যাতে তদন্তকারীরা বুঝতে পারে তিনি জীবিত আছেন। এমন কি গত ১৮ তারিখ এমপির ব্যক্তিগত সহকারীকে একটি ম্যাসেজ পাঠায় যে, আমি দিল্লি যাচ্ছি। আমার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আছেন। দিল্লির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত সাহার সঙ্গে আমার একটি মিটিং আছে। এই বার্তাগুলো আমার যখন পেয়েছি তখনই বুঝতে পেরেছি হত্যাকারীরা নিজেদের আড়াল করতে এই বার্তা পাঠিয়েছে। সব কিছু মিলিয়ে তারা এই হত্যাটি করেছে।



 

নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

কমেন্ট বক্স
প্রতিবেদকের তথ্য